মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ ধর্মীয় জমায়েত টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ কান্দলভীর অংশ নেয়াকে ঘিরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। তিনি তাবলীগ জামাতের দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের জিম্মাদার। গত কয়েক বছর ধরে তিনি টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার মোনাজাত পরিচালনা করে আসছেন। এবারের ইজতেমায় তার অংশ নেয়াকে কেন্দ্র করে গত জোড় ইজতেমা থেকে তাবলীগ জামাতের মুরব্বি ও ইজতেমা আয়োজকদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। তাবলীগ জামাতের একাংশের মুরব্বিরা বলছেন, মাওলানা সাদ বেশকিছু  বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছেন যা কোরআন-সুন্নাহ্‌ বিরোধী। তাই তাকে ইজতেমায় তারা অংশ নিতে দেবেন না।
অন্য পক্ষ মাওলানা সাদকে দিয়েই ইজতেমার আখেরি মোনাজাত পরিচালনার তৎপরতা চালিয়ে আসছেন। আগামীকাল শুক্রবার থেকে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শুরু হচ্ছে। ইজতেমাকে সামনে রেখে প্রস্তুত করা হয়েছে ইজতেমা ময়দান।
মাওলানা সাদ কান্দলভীর ঢাকা আসাকে ঘিরে গতকাল দিনভর হযরত শাহ্‌জালাল রহ. আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনের সড়ক আটকে বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন তাবলীগ জামাতের একাংশের লোকজন। তাদের বেশির ভাগই কওমি মাদ্‌রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। তাদের এ কর্মসূচির কারণে ব্যস্ততম বিমানবন্দর সড়কে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত যান চলাচল ব্যাহত হয়। দুই পাশের সড়কে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি হওয়ায় দুই পাশে আটকা পড়ে হাজার হাজার যানবাহন। এতে আটকেপড়া যাত্রীরা দিনভর সীমাহীন দুর্ভোগ পোহান। বিমানবন্দরে প্রবেশ ও বের হতে গিয়ে দুর্ভোগ  পোহান বিমানযাত্রীরা। দীর্ঘ যানজটে আটকে মালপত্র নিয়ে অনেককে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে যেতে দেখা যায়। সকাল থেকে চলা বিক্ষোভ ও অবরোধের মধ্যেই দুপুরে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে মাওলানা মোহাম্মদ সাদ কান্দলভী ঢাকায় পৌঁছান। তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশের তাবলীগ জামাতের মারকাজ কাকরাইল মসজিদে পৌঁছে দেয়া হয়। তিনি কাকরাইলে পৌঁছার খবর পেয়ে অবরোধকারীরা টঙ্গী ইজতেমা ময়দান এবং কাকরাইল মসজিদের সামনে লাগাতার অবস্থানের ঘোষণা দেন। অবস্থান নেয়া তাবলীগ কর্মীরা দুইদিকে ভাগ হয়ে অবস্থানস্থল ছেড়ে যান। সন্ধ্যার পর কিছু কর্মী কাকরাইল মসজিদের সামনে অবস্থান নিতে চাইলে পুলিশ তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। মাওলানা সাদ এর কাকরাইল মসজিদে অবস্থানের আগ থেকেই ওই এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কাকরাইল মসজিদের সামনে ও আশপাশের সড়কে কড়া পুলিশ প্রহরা ছিল। বিকাল থেকে মসজিদে সাধারণ কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। ফটকে দায়িত্বে থাকা তাবলীগের কর্মীরা শনাক্ত করার পরই কেবল তাবলীগ কর্মীদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। এদিকে ইজতেমায় মাওলানা মোহাম্মদ সাদের অংশগ্রহণ ঠেকাতে লাতার অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন তার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী সংগঠন বাংলাদেশ কওমি মাদ্‌রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের নেতারা। গতকাল বিকাল থেকেই এ অবস্থানের ঘোষণা দেন বেফাকের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুস এবং সহকারী মহাসচিব মুফতি মাহফুজুল হক।
তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস শাহ্‌ রহ: এর দৌহিত্র মাওলানা সা’দ তাবলীগের মারকাজ নিজামুদ্দিনের জিম্মাদার হিসেবে রয়েছেন। তার কিছু বক্তব্য ও একক নেতৃত্বের বিষয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে মুরব্বিদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। মতবিরোধ থেকে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাওলানা সাদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়, আর নিজামুদ্দিন ছেড়ে চলে যান মাওলানা ইবরাহিম দেওলাসহ বেশ কয়েকজন মুরব্বি। এই বিভক্তির রেশ ছড়িয়ে পড়ে অন্য কারকাজগুলোতেও। বাংলাদেশের কওমি মাদ্‌রাসাগুলো দারুল উলুম দেওবন্দকে অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। কওাম অনুসারী তাবলীগ কর্মীরা তাই মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। বেশ কিছুদিন ধরে কাকরাইল মসজিদের মুরব্বিদের মধ্যেও বিরোধ চলে আসছে। কয়েক দফা তা প্রকাশ্যে রূপ নেয়। সর্বশেষ এই বিরোধকে কেন্দ্র করে জোড় ইজতেমার নির্ধারিত একদিন আগেই মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ করে দেয়া হয়। জোড়ে তাবলীগের মুরব্বি ও ইজতেমা আয়োজকরা মাওলানা সা’দের অংশ নেয়াকে নিয়ে বিতর্কে জড়ান।
তাবলীগ জামাতের কাকরাইল শূরার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সদস্য জানিয়েছেন, বিতর্কিত ও আপত্তিকর মন্তব্যের কারণের সমালোচিত মাওলানা সাদের আগমন ঠেকাতে বুধবার সকাল থেকে বিমানবন্দরের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিক্ষোভ করছেন তাবলীগ জামাতের একটি অংশ এবং আলেম-ওলামাগণ। অন্যদিকে মাওলানা সাদের সমর্থকরা জানান, টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ অংশ নিতে না পারলে এদেশে আর বিশ্ব ইজতেমা হবে না। গত রোববার টঙ্গীতে ইজতেমার প্রস্তুতি পর্যালোচনা সভায় তাবলীগের একজন মুরব্বীও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, মাওলানা সা’দ যাতে ইজতমোয় অংশ নিতে না পারেন সেজন্যে নানা ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তিনি না আসতে পারলে এদেশে বিশ্ব ইজতেমা আর হবে না।
যানজটে দিনভর দুর্ভোগ: এদিকে মাওলানা সাদ বিরোধী অবস্থানের কারণে ঢাকা-গাজীপুর ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলাচলকারী সব বাস সকাল থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকায় যাত্রীদের অনেককে বাস থেকে নেমে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। তাবলীগের একাংশের কর্মীরা সকাল ৯টার দিকে বিমানবন্দর এলাকায় বিক্ষোভ শুরু করলে সড়কের দুই পাশে যানজট দেখা দেয়। পুলিশের চেষ্টায় বিমানবন্দর  গোল চত্বর থেকে হাতেগোনা কিছু যানবাহন বনানীর দিকে আসতে পারলেও বিমানবন্দর থেকে টঙ্গী বাজার ছাড়িয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত রাস্তায় যানবাহন স্থবির হয়ে পড়ে। দুপুরের পর বিমানবন্দর থেকে বনানী পর্যন্ত যানজট গিয়ে ঠেকে। এতে আটকা পড়েন হাজার হাজার যাত্রী। বিমানবন্দরে ফ্লাইট ধরতে বের হওয়া যাত্রীদের অনেকে যানজটে আটকে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছান। এছাড়া বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরাও বের হতে পারছিলেন না যানজটের কারণে। অনেককে মালপত্র নিয়ে বিমানবন্দরের সামনের চত্বরে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মাসুদ জানান, দুপুর ১২টার দিকে উত্তরার অফিস থেকে বনানীতে যাওয়ার জন্য রওনা হন। কিন্তু যানজটের কারণে গাড়িতে প্রায় ঘণ্টাখানেক বসে থাকার পর আবার বাসায় ফিরে যান। উত্তরার বাসিন্দা মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেন জানান, জরুরি কাজে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে মতিঝিলের উদ্দেশে বের হয়েছিলেন দুপুরে। যানজটে আটকে ঘণ্টা পার করার পর তিনি উল্টোপথে আশুলিয়া বেড়িবাঁধ হয়ে মিরপুর দিয়ে মতিঝিল যান। এদিকে বিকাল চারটার পর অবরোধকারীরা বিমানবন্দর এলাকায় ছেড়ে দিলে যানবাহন চালাচল শুরু করে। তবে সারা দিন সড়কে যান আটকে থাকায় সন্ধ্যার পরও ধীর গতিতে যানবাহন এগোতে দেখা যায়।
উল্লেখ্য, শতবছর আগে দ্বীন ও ইসলামের দাওয়াতি কাজ তাবলীগকে তরান্বিত করতে মাওলানা ইলিয়াস শাহ্‌ (রহ:) দিল্লির নিজামুদ্দিন মসজিদ থেকে তাবলীগের কাজ শুরু করেন। মাওলানা ইলিয়াস (রহ:)-এর ছেলে মাওলানা হারুন (রহ:) পরে নিজামুদ্দিনের জিম্মাদার ছিলেন। মাওলানা হারুনের ছেলে মাওলানা সা’দ কান্দলভী এখন বিশ্ব তাবলীগ মারকাজের জিম্মাদার।
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা থেকে জানান, কুমিল্লায় কওমি মাদ্‌রাসা সংগঠনের উদ্যোগে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। গতকাল বুধবার নগরীর মনোহরপুর- লাকসাম সড়কের জামিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলুম মাদরাসা থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়ে কান্দিরপাড় এলাকায় গিয়ে সমবেত হয়ে বিশাল মানববন্ধন করে। ভারতের নিজামুদ্দিনের মাওলানা সাদ কান্দলভীর বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে বাংলাদেশে আগমনের প্রতিবাদে সংগঠনটি এ কর্মসূচি পালন করে। সংগঠনের কুমিল্লা শহর শাখার সভাপতি মাওলানা মুনীর হোসাইনের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন- নায়েবে মুহ্‌তামিম মাওলানা আবদুল কুদ্দুছ, মাওলানা সালমান, মাওলানা আনোয়ারুল্লাহ, মাওলানা আবুল খায়ের, মাওলানা আহসানুল্লাহ, মাওলানা ইসমাঈল, মাওলানা আবুল কাশেম, মাওলানা আহমদুল্লাহ প্রমুখ। তারা মাওলানা সা’দ যতদিন পর্যন্ত কুরআন-সুন্নাহ্‌ বিরোধী বিতর্কিত বক্তব্য প্রত্যাহার করে তওবা না করবেন ততদিন পর্যন্ত বিশ্ব ইজতেমায় তার আগমনকে প্রতিহত করা হবে। এ ব্যাপারে তারা তৌহিদী জনতাকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান।
বিশ্ব ইজতেমার শুরু কাল থেকে: বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব আগামীকাল ১২ই জানুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে। ১৪ই জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে প্রথম পর্ব। মাঝে ৪ দিন বিরতি দিয়ে ১৯শে জানুয়ারি শুক্রবার থেকে শুরু হবে দ্বিতীয় পর্ব। ২১শে জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্যে দিয়ে দুই পর্বের বিশ্ব ইজতেমা শেষ হবে। এরই মধ্যে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে ইজতেমা ময়দান মুসল্লিদের জন্য সম্পন্ন প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশাল ময়দানজুড়ে টাঙানো হয়েছে চটের সামিয়ানা। জেলাওয়ারি খিত্তার ভাগসহ বিদেশি মেহমানদের জন্য ইজতেমা ময়দানের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে টিন শেডের আলাদা থাকার জায়গা। ইজতেমা সফলভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রথম পর্বে ১৭টি জেলার মুসল্লিরা অংশ নেবেন। ইজতেমার সার্বিক কাজের প্রায় সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইজতেমার মুরব্বি মাওলানা গিয়াস উদ্দিন। তিনি জানান, বিশ্ব ইজতেমা সফল ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন এবং দ্বীনের মেহনত কায়েমের লক্ষ্যে জোড় ইজতেমা থেকেই মুসল্লিরা দলে দলে ভাগ হয়ে ইজতেমার মাঠে কাজ করেছেন। প্রতি বছরের মতো স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে স্কুল-কলেজ-মাদ্‌রাসার শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইজতেমা মাঠে প্রস্ততিমূলক কাজ করেন। তাবলীগ জামাতের উদ্যোগে ১৬০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ইজতেমা মাঠে বিশ্বের প্রায় সব মুসলিম দেশ থেকেই তাবলীগ জামাতের অনুসারী ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা অংশ নেন।
যেসব জেলার মুসল্লিরা অংশ নেবেন: ২০১৮ সালের বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নেয়া জেলাগুলো হলো- ঢাকা, শেরপুর, নারায়ণগঞ্জ, নীলফামারী, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, গাইবান্ধা, লক্ষ্মীপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম, নড়াইল, মাদারীপুর, ভোলা, মাগুরা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, পঞ্চগড়, ঝিনাইদহ, জামালপুর, ফরিদপুর, নেত্রকোনা, নরসিংদী, কুমিল্লা, কুড়িগ্রাম, রাজশাহী, ফেনী, ঠাকুরগাঁও, সুনামগঞ্জ, বগুড়া, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা এবং পিরোজপুর।  সূত্রঃ মানবজমিন ।

bdwebhost24.com