মিয়ানমারে যখন ‘যুদ্ধাপরাধ’ ঘটছিল গত বছর তখনও তাদেরকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহতভাবে দিয়ে যাচ্ছিল ইসরাইল। মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ দেয়ার বিষয়ে দেড় বছর আগে ইসরাইলের হাই কোর্ট অব জাস্টিসে একটি পিটিশন দিয়েছিলেন মানবাধিকার কর্মী ও এটর্নি ইতাই ম্যাক। কিনতু ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তখন বলে দেয়া হয়েছিল যে, প্রতিরক্ষা বা অস্ত্র বিক্রি খাতে কোনো রুলিং দেয়ার এক্তিয়ার নেই আদালতের। অন্যদিকে ইসরাইলের এক মুখপাত্র অভিযোগ করেন, মিয়ানমারে উভয় পক্ষই যুদ্ধাপরাধ করেছে। আরও অভিযোগ করেন যে, এই বিষয়টি জাতিসংঘের সর্বশেষ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় নি। ইসরাইলের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য হারেটজের এক সম্পাদকীয়তে এসব কথা বলা হয়েছে।

‘ডার্টি ডিলস’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই সম্পাদকীয়তে আরো বলা হয়, এ সপ্তাহে জাতিসংঘ একটি রিপোর্ট দিয়েছে। তাতে দেখা গেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গণহত্যা ও মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ধর্ষণ, নির্যাতন, দাসত্ব, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস হরে দেয়া। তারা সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে এসব ঘটিয়েছে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে সেনাবাহিনীর এমন অপরাধমুলক অভিযান শুরু হয়ে তা ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে।  ২০১৭ সালের আগস্টে এসে তা চূড়ান্ত রূপ নেয়। এতে ভীত সঙ্কিত হয়ে মিয়ানমার ছেড়ে ৭ লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
নির্যাতনের হাত থেকে বেঁচে আসা কয়েক শত রোহিঙ্গার সাক্ষাতকারের ওপর ভিত্তি করে এই রিপোর্ট তৈরি করেছে জাতিসংঘের নিরপেক্ষ সংস্থা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন। এই রিপোর্টে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান ও শীর্ষ স্থানীয় জেনারেলদেরকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অথবা একটি আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ওই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন যে মাত্রায় সহিংসতা চালানো হয়েছে তাকে একটি পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ, চরম মাত্রার নৃশংস সহিংসতা বলে আখ্যায়িত করে এর বিচার করার আহ্বান জানিয়েছে।
এই অভিযান পরিচালনা ও গণহত্যার আদর্শিক ফর্মুলা তৈরির অংশীদার হিসেবে ওই রিপোর্টে পরিষ্কারভাবে দায়ী করা হয়েছে মিয়ানমারের সেবানাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে।
মিয়ানমারের ওপর প্রণীত এ রিপোর্টে এসব যুদ্ধাপরাধের জন্য সহযোগী হিসেবে ইসরাইল সরকারের নাম উল্লেখ করা হয় নি। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে মিন অং হ্লাইং ইসরাইল সফর করেন। তিনি তখন প্রতিরক্ষা বিষয়ক সিনিয়র কর্মকর্তা ও প্রেসিডেন্ট রুভেন রিভলিনের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। এ ছাড়া তিনি ইয়াদ ভাশেম হলোকাস্ট মেমোরিয়ান ও জাদুঢ়র পরিদর্শন করেন। এ ছাড়া সামরিক স্থাপনা ও সামরিক অস্ত্র তৈরির কারখানাও পরিদর্শন করেন। এরপর তিনি ইসরাইল থেকে  কয়েক শত কোটি ডলারের অস্ত্র কেনার চুক্তির ঘোষণা দেন।
২০১৬ সালের গ্রীষ্মে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইন্টারন্যাশনাল ডিফেন্স কো-অপারেশন ডিরেক্টটরেটের প্রধান এর প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমার সফর করেন। মিন অং হ্লাইয়ের ফেসবুক পেহে এসব রিপোর্ট করা হয়েছে। তবে ঘৃণা ছড়িয়ে দেয়া এবং মিথ্যা তথ্য দেয়ার অভিযোগে তাকে ফেসবুক নিষিদ্ধ করেছে সোমবার।
মিয়ানমারে অস্ত্র বিক্রির কোনো রিপোর্ট প্রকাশ করতে অনুমোদন দেয় না ইসরাইলের কোনো কর্মকর্তা। এ নিয়ে দেড় বছর আগে হাই কোর্ট অব জাস্টিসে একটি আবেদন করেছিলেন মানবাধিকার কর্মী ও এটর্নি ইতাই ম্যাক। কিন্তু এর জবাবে আদালত যে রুলিং দিয়েছে তাকে গোপন বা ক্লাসিফায়েড করা হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার থেকে যে রিপোর্ট পাওয়া যায়, তাতে তাদের কাছে ইসরাইলের অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। অন্ধকারে থাকা শাসকগোষ্ঠীদের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে ইসরাইলের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। তারা অস্ত্র সরবরাহ দিয়ে আসছে লাতিন আমেরিকা থেকে বলকান ও আফ্রিকা হয়ে এশিয়া পর্যন্ত। জাতিসংঘের প্যানেলের ওই রিপোর্টে এ পদ্ধতি যাচাই করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এই নৃশংসতার দায় না নিয়ে ইসরাইলের অর্থনীতি সুবিধা নিতে পারে না। ইসরাইল ১৯৫০ সালে ‘ল ফর দ্য প্রিভেনশন অ্যান্ড পানিশমেন্ট অব দ্য ক্রাইম অব জেনোসাইড’ যারা অনুমোদন করেছিলেন তারাই মিয়ানমারে অস্ত্র বিক্রি করে যুদ্ধাপরাধ করেছেন কিনা তা নির্ধারণে অবশ্যই একটি তদন্তের নির্দেশ দিতে হবে এটর্নি জেনারেল আভিচাই মেন্ডেলব্লিটকে। উপরন্ত সেই তদন্ত তাকে অবশ্যই প্রকাশ্যে আনতে হবে। – মানবজমিন 

Facebook Comments
bdwebhost24.com