নব্বই দশক পর্যন্ত মাদারীপুরে সংসদীয় আসন ছিল চারটি। এরশাদ সরকার একটি আসন কেটে রংপুরে নিয়ে যাওয়ায় বর্তমানে জেলায় সংসদীয় আসন তিনটি। জুলাই অভ্যুত্থানে পটপরিবর্তনের পর আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ তিনটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বিজয়ী হওয়ার জন্য জমরিয়া হয়ে উঠেছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের মধ্যে অনেকেই বর্তমানে কারাগারে, কেউ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, কেউ-বা পলাতক জীবন যাপন করছেন। ফলে নির্বাচনী মাঠে শক্ত অবস্থান এখন বিএনপির। তবে মাদারীপুর-১ ও মাদারীপুর-২ আসনে অন্যান্য দল প্রার্থী দিলেও বিএনপি এখনো প্রার্থী দিতে পারেনি।
এই দুই আসনে মনোনয়ন পেতে দলের ১৫ জন নেতা শোডাউনের মাধ্যমে জানান দিচ্ছেন নিজ নিজ শক্তি। মনোনয়ন দৌড়ে কে এগিয়ে যাবেন তা নিয়ে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। তাদের মধ্যে বিভক্তিও দৃশ্যমান।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনও সরব রয়েছে নির্বাচনী মাঠে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী নির্বাচনের সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। এখন শুধু ঘোষণার অপেক্ষা। একটি আসনে এক জন স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছেন। নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় মনোনীত প্রার্থী ও মনোনয়নপ্রত্যাশীরা গণসংযোগের পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। চষে বেড়াচ্ছেন গ্রামগঞ্জ। অংশ নিচ্ছেন উঠান বৈঠকে।
মাদারীপুর-১ (শিবচর): শিবচর উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে মাদারীপুর-১ আসন গঠিত। বরাবরই এই আসন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে খ্যাত ছিল। তবে এখন তাদের কেউ মাঠে নেই। এ কারণে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিচ্ছে বিএনপি। তবে দলটি এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি।
এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ৯ জন। এদের মধ্যে জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী লাবলু (গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন), উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও নবগঠিত কমিটির সদস্য কামাল জামান মোল্লা (মনোনয়ন দেওয়ার পরের দিন স্থগিত হয়ে যায়), সাবেক সংসদ সদস্য নাভিলা চৌধুরী, উপজেলা যুগ্ম-আহ্বায়ক নাদিরা মিঠু চৌধুরীসহ অন্যান্য মনোনয়নপ্রত্যাশী মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন প্রচার-প্রচারণায়।
শিবচর উপজেলা বিএনপির নবগঠিত কমিটির আহ্বায়ক মো. শাহাদাত হোসেন খান বলেন, ‘শিবচরে ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থী যে হবেন, স্থানীয় বিএনপি তার জন্যই কাজ করবে।’
এদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থী সারোয়ার হোসেন মৃধাকে সামনে রেখে নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। এনসিপি থেকে মনোনয়নপত্র ক্রয় করেছেন শেখ মাসুদ, ব্যারিস্টার মেঘা ও আবদুল হামিদ খান। এই আসনটিতে আরো যারা দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন তারা হলেন—ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা আকরাম হুসাইন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি রাকীব হাসান ওসমান ও খেলাফত মজলিসের মাওলানা শাহআলম তালুকদার।
মাদারীপুর-২ (সদর-রাজৈর): সদরের ১০টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা ও রাজৈর উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে মাদারীপুর-২ আসন গঠিত। জেলার সংসদীয় আসনের মধ্যে এই আসনটি বড় এবং ভোটার সংখ্যা বেশি। এই আসনে মাঠে সরব বিএনপির ছয় জন মনোনয়নপ্রত্যাশী।
এছাড়া জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। বিএনপির দুঃসময়ের পরীক্ষিত সৈনিকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এ আসনেও এখনো কাউকেই দলীয় মনোনয়ন দিতে পারেনি বিএনপি। তাই দলীয় মনোনয়ন পেতে দলের কেন্দ্রীয় সহশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক এবং সংরক্ষিত আসনের সাবেক এমপি ইডেন কলেজের সাবেক ভিপি হেলেন জেরিন খান, জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাহান্দার আলী জাহান ও মাদারীপুর জেলা বিএনপির সদস্য মিল্টন বৈদ্য নির্বাচনী মাঠে বেশি সরব রয়েছেন।
এছাড়া দলটির অন্যান্য মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মো. জাফর আলী মিয়া, সাবেক ছাত্রদল নেতা ব্যারিস্টার শহীদুল ইসলাম খান, মাদারীপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক ও মাদারীপুর সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ প্রমুখ। এনসিপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী দুই জন। তারা হলেন মেরাজুল ইসলাম ও জাবের হাওলাদার।
অন্যান্য দলের মনোনীত প্রার্থীরা হলেন—জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুস সোবাহান খান, ইসলামী আন্দোলন জেলার সাবেক সভাপতি মো. লোকমান হোসেন জাফরী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী টেকেরহাট বন্দরের পীরজাদা আল্লামা কামরুল ইসলাম সাঈদ আনসারী।
মাদারীপুর-৩ (কালকিনি ও ডাসার): কালকিনি ও ডাসার উপজেলা নিয়ে মাদারীপুর-৩ আসন গঠিত। এ আসন বরাবরই আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে সরকারের পতনের পর বর্তমানে রাজনৈতিক ময়দানে বিএনপি সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহগণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আনিসুর রহমান তালুকদার খোকনকে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী দলের কালকিনি পৌরসভার আমির মো. রফিকুল ইসলাম মৃধা ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ইসলামী যুব আন্দোলনের ফরিদপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা এস এম আজিজুল হক।
এনসিপির পক্ষ থেকে এখনো মনোনয়ন না দেওয়া হলেও দলটির জেলা কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী ও জুলাই যোদ্ধা সোসাইটির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. শহিদুল ইসলাম এলাকায় রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন।




