হাসিনার ‘পিয়ন’ জাহাঙ্গীরের পরিবারের সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত

0
172

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী (পিয়ন) জাহাঙ্গীর আলমের নামে থাকা প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকার জমি ও ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তার স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে থাকা সাতটি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পৃথক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. সাব্বির ফয়েজ এ আদেশ দেন।

আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ হোসেন জানান, জাহাঙ্গীর আলমের নামে নোয়াখালীর সদর উপজেলা ও চাটখিলে মোট ৩৫ শতাংশ জমি জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার বাজারমূল্য এক কোটি ৩৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭৪০ টাকা। পাশাপাশি মিরপুরে অবস্থিত ১ হাজার ৩৮৫ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটও জব্দ করতে বলা হয়েছে, যার মূল্য ধরা হয়েছে ৪১ লাখ ৮২ হাজার টাকা।

এ ছাড়া কামরুন নাহারের নামে থাকা যে সাতটি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে মোট এক কোটি তিন লাখ ৫৩ হাজার ৩৬৯ টাকা রয়েছে বলেও আদালতকে জানানো হয়।

জমি ও ফ্ল্যাট জব্দ এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আবেদন করেন দুদকের সহকারী পরিচালক পিয়াস পাল। আবেদনে বলা হয়, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত ও মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৬২৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ায় দুদক মামলা করেছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তার নামে থাকা সম্পদ জব্দ করা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

কামরুন নাহারের বিষয়ে আবেদনে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে ছয় কোটি ৮০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তার নামে খোলা সাতটি সঞ্চয়ী ও ডিপিএস হিসাবে মোট পাঁচ কোটি ৯৬ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ায় দুদক পৃথক মামলা করেছে। এ কারণে তদন্তের স্বার্থে এসব হিসাব অবরুদ্ধ করা জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়।

এর আগে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা তার বাসায় কর্মরত এক পিয়নের বিপুল সম্পদের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার বাসায় কাজ করেছে, পিয়ন ছিল সে, এখন ৪০০ কোটি টাকার মালিক। হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না। বাস্তব কথা। কী করে বানাল এত টাকা? জানতে পেরেছি, পরেই ব্যবস্থা নিয়েছি।’ ওই সময় তিনি নাম উল্লেখ না করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাহাঙ্গীর আলমকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে তার ব্যাংক হিসাব স্থগিতের নির্দেশ আসে।

জাহাঙ্গীর আলম টানা দুই মেয়াদে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা বিরোধী দলে থাকার সময়ও জাহাঙ্গীর তার ব্যক্তিগত স্টাফ হিসেবে কাজ করেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার জন্য বাসা থেকে নেওয়া খাবার ও পানি বহনের দায়িত্বে থাকায় তিনি ‘পানি জাহাঙ্গীর’ নামে পরিচিতি পান।

নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম একসময় চাটখিল উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হতে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় ব্যবহার করে তদবিরের মাধ্যমে তিনি বিপুল অর্থের মালিক হন এবং নোয়াখালী ও ঢাকায় উল্লেখযোগ্য সম্পদ গড়ে তোলেন। এ অবস্থায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।

জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের ঘোষণা দেয় দুদক। মামলার আগে তার বিরুদ্ধে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নের নাহারখিল গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান এবং তিনি একসময় জাতীয় সংসদে দৈনিক মজুরিতে কাজ করতেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিনি অর্থবিত্তের মালিক হতে শুরু করেন। সবশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-১ (চাটখিল–সোনাইমুড়ী) আসন থেকে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দেন তিনি। হলফনামায় জাহাঙ্গীর আলম নিজের নামে প্রায় ২১ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য দেন এবং তার স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে দেখানো হয় সাত কোটি ৩০ লাখ টাকার সম্পদ।

এর আগে গত বছরের ৩০ জানুয়ারি আদালত জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রী কামরুন নাহারের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × 3 =