সারা দেশের ন্যায় ময়মনসিংহে কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে বাড়ছে খুন, ছিনতাই, মাদকসহ নানান অপরাধ।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ নগরের ঐতিহ্যবাহী আনন্দ মোহন কলেজের দুই শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ শাওন ও তার বন্ধু মঞ্জুরুল আহসান (রিয়াদ) ব্রহ্মপুত্র নদের বিপরীত পাশে বেড়াতে যান। ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ে বেড়াতে গিয়ে তারা ছিনতাইকারী ‘কিশোর গ্যাং’-এর কবলে পড়েছিলেন। মঞ্জুরুল আহসান (রিয়াদ) সাঁতরে বেঁচে ফিরলেও নুরুল্লাহ শাওন সাঁতার না জানায় ব্রহ্মপুত্র নদে প্রাণ হারায়।
সাত জনের কিশোর গ্যাং দল আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী নরুল্লাহ শাওনের কাছ থেকে মোবাইলসহ সবকিছু ছিনতাই করে ব্রহ্মপুত্র নদে পানিতে ফেলে দেয়। অভিযুক্ত কিশোরদের সবার বয়স ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। তারা নগরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সপ্তম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের দাবিতে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা হলে তাদের গ্রেফতার করে।
২৪ ফেব্রুয়ারি বিকালে অটোরিকশায় করে গাঙ্গিনারপাড় থেকে চরপাড়ায় যাচ্ছিলেন কলেজছাত্র শোবাশশীর ইসলাম সাদ। পথে যাত্রী বেশে অটোরিকশায় ওঠে ছিনতাইকারী চক্রের চার সদস্য। ছুরি ঠেকিয়ে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় মানিব্যাগ-মোবাইল।
এদিকে গত ৩ জানুয়ারি নগরের জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিফতাহুল জান্নাত নিলয় তালুকদারকে (১৫) ছুরিকাঘাত করে তারই সহপাঠীরা। ‘কিশোর গ্যাং’-এ যোগ না দেওয়ায় স্কুল বন্ধের দিন সহপাঠীরা বাসা থেকে স্কুলে ডেকে নিয়ে পিঠে, হাতে, কোমর ও পায়ে অন্তত সাতটি ছুরিকাঘাত করে। এ ঘটনায় ১০ জানুয়ারি কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা করেন মিফতাহুল জান্নাতের বাবা। মামলায় চার জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় চার থেকে পাঁচ জনকে আসামি করা হয়।
আসামিরা জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির ডে শিফটের শিক্ষার্থী। আর মিফতাহুল মর্নিং শিফটের শিক্ষার্থী ছিল। মিফতাহুলের বাবা সাদেকুল ইসলাম তখন বলেছিলেন, ‘ঘটনার দিন বিকালে আমার ছেলেকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায় তার সহপাঠীরা। স্কুলের ভেতরে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ছুরিকাঘাত করে। যারা ছুরিকাঘাত করে, তারা সবাই মাদকাসক্ত। আমার ছেলেকে তাদের দলে নিতে চেয়েছিল। সে যেতে রাজি না হওয়ায় ছুরিকাঘাত করা হয়। আমি এর বিচার চাই।’
স্থানীয় লোকজন জানান, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উঠতি বয়সি শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে কিশোর গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়ছে। নানা অপরাধসহ মাদকের সঙ্গেও জড়াচ্ছে। এক দল আরেক দলের সঙ্গে মারধর, ছিনতাই এসব ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। কিন্তু এসব রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ জেলায় ১১১টি খুনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে অন্তত ২০টি ঘটনা ছিনতাই সংশ্লিষ্ট। ছিনতাইকারী অধিকাংশ কিশোর। ২০২৫ সালে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬০টি, গ্রেফতার হয়েছে ৪৬৭ জন। তাদের মধ্যে ৩৬২ জনই নগরীর স্টেশন রোড, পুরোহিতপাড়া, সানকিপাড়া ও মীরবাড়ী এলাকার বাসিন্দা। ২০২৫ সালে ময়মনসিংহে হত্যা ও চুরির পরিসংখ্যান অনুযায়ী- জানুয়ারিতে হত্যা হয়েছে পাঁচ জন, চুরির ঘটনা আটটি।
ফেব্রুয়ারিতে হত্যা হয়েছে সাত জন, চুরির ঘটনা আটটি। মার্চে হত্যা হয়েছে ১১ জন, চুরির ঘটনা ২২টি। এপ্রিলে হত্যা হয়েছে সাত জন, চুরির ঘটনা ১৬টি। মে মাসে হত্যা হয়েছে আট জন, চুরির ঘটনা ৩০টি। জুনে হত্যা হয়েছে ১২ জন, চুরির ঘটনা ১৭টি। জুলাইয়ে হত্যা হয়েছে ১৪ জন, চুরির ঘটনা ২৫টি।
আগস্টে হত্যা হয়েছে ৯ জন, চুরির ঘটনা ২২টি। সেপ্টেম্বরে হত্যা হয়েছে পাঁচ জন, চুরির ঘটনা ২৯টি। অক্টোবরে হত্যা হয়েছে ২০ জন, চুরির ঘটনা ২৬টি। নভেম্বরে হত্যা হয়েছে আট জন, চুরির ঘটনা ২৬টি এবং ডিসেম্বরে হত্যা হয়েছে পাঁচ জন, চুরির ঘটনা ২২টি।
বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, ময়মনসিংহ নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি মাসে গড়ে এক হাজারেরও বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। শুধু কোতোয়ালি থানায় প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০টি অভিযোগ জমা পড়ে। তবে আইনি জটিলতা, পুলিশের প্রতি অনাস্থা ও সামাজিক হয়রানির ভয়ে ভুক্তভোগীর বড় অংশ থানায় অভিযোগ কিংবা মামলা করেন না। গ্রেফতার ছিনতাইকারীদের প্রায় ৯০ ভাগই মাদকাসক্তও কিশোর। নগরীর শম্ভুগঞ্জ, ব্রিজ মোড়, কেওটখালী, বাকৃবি শেষ মোড়, সানকিপাড়া, মীরবাড়ী, কলেজ রোড, মাদ্রাসা কোয়ার্টার, কাশর রোড, বাইপাস মোড়, গাঙ্গিনারপাড়, স্টেশন রোড, পুরোহিতপাড়া, বাঘমারা, চরপাড়া, মাসকান্দা এবং জয়নুল আবেদিন পার্ক এলাকাগুলো ছিনতাইয়ের ‘হটস্পট’। এসব এলাকায় রাতে-দিনে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে হরহামেশাই।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগরের সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারী দলের দৌরাত্ম্য ও মাদক নিয়ে নগরবাসী দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবজ্ঞা দায়ী। কঠোরভাবে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। জনপ্রতিনিধিদেরও এ বিষয়ে কাজ করতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ জেলার সম্পাদক ইয়াজদানী কোরায়শী কাজল বলেন, নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজারেরও বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। গত মাসে আমার বাসাতেও দুইবার চুরির ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অপরাধ চক্র। তাই ঈদে ঘরবাড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রেখে ছুটিতে যাওয়া নিয়ে আতঙ্কে আছেন বাসিন্দারা। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে নিরাপত্তা ঝুঁকি আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাদক, চুরি ও ছিনতাই দমনে প্রশাসনের সক্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘কিশোর দলটি নিজেদের এলাকায় সন্ধ্যার দিকে যারা ঘুরতে যায়, তাদের “ঠেক” দিত। তারা সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। ’
কিশোর গ্যাং নিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা একজনের কমান্ডে চলে। যখনই এক দিকে যায়, দল বেঁধে যায়। কেউ কেউ মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত। বেশির ভাগ অপ্রাপ্তবয়স্ক। এদের খুব সফটলি হ্যান্ডল করতে হয়। আমরা এসব নিয়ে কাজ করছি।’
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন আরো বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বস্তি দিতে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে জেলা পুলিশ দিনরাত কাজ করছে। আমাদের নিয়মিত টহল কার্যক্রমের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি, কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তি দেখলে তাৎক্ষণিক নিকটস্থ থানা পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানাচ্ছি।




