ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও দ্বীপে আঘাত ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪১

0
2

ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও দ্বীপে আঘাত হানা রিখটার স্কেলের ৭ দশমিক ৮ মাত্রার একটি ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৪১ জনে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গলবার (৯ জুন) দেশটির জাতীয় ও স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এ পর্যন্ত ৪৭৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন এবং এখনো অন্তত চারজন নিখোঁজ রয়েছেন।

শক্তিশালী এই ভূকম্পনের ফলে সৃষ্ট সুনামি আতঙ্ক এবং ক্রমাগত পরাঘাত বা আফটারশকের কারণে মিন্দানাওয়ের প্রায় ৮৮ হাজার মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২২ হাজার ৬৯০ জন বাসিন্দা ঘরবাড়ি হারিয়ে সম্পূর্ণ বাস্তুচ্যুত হয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন।

ভূমিকম্পের তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সারঙ্গানি প্রদেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ধসে পড়া এবং একটি সেতু ভেঙে যাওয়ায় বহু এলাকা মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ধসে পড়া রাস্তাঘাটের কারণে এসব দুর্গম অঞ্চলে কেবল হেলিকপ্টারের সাহায্যে ত্রাণ ও উদ্ধার সামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে এবং আগামী অন্তত এক সপ্তাহ এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থা বজায় থাকবে। আঞ্চলিক বেসামরিক প্রতিরক্ষা প্রধান রদ্রিগো সোসমেনা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, প্রথম বড় কম্পনের পর শত শত ছোট ছোট পরাঘাত অব্যাহত থাকায় উদ্ধারকর্মীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা বাড়াচ্ছেন, যা উদ্ধার তৎপরতার গতিকে কিছুটা ধীর করে দিয়েছে।
ভূমিকম্পের তীব্র আতঙ্কের মাঝেও এক মানবিক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শহর জেনারেল সান্তোসের একটি হাসপাতালের বাইরে। সেখানে ভবনের কাঠামোগত সুরক্ষার অভাবে খোলা মাঠে তাবু খাটিয়ে চিকিৎসকেরা রোগীদের সেবা দিচ্ছেন এবং তীব্র রোদের মাঝেই এক প্রসূতি মা একটি সুস্থ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।

অন্যদিকে গ্লান পৌরসভায় একটি পাহাড় ধসে ১৩ জন মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ির নিচে চাপা পড়েছেন এবং আরেকটি হাসপাতালের ৬০ জনেরও বেশি রোগীকে খোলা মাঠে বিছানা পেতে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের প্রকৌশলীরা পরীক্ষা শেষে মূল ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছেন।

এই বিধ্বংসী ভূমিকম্পে অঞ্চলজুড়ে অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৯০ কোটি পেসো বা ১ কোটি ৪৬ লাখ মার্কিন ডলার। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ৯টি সেতু ও ১৯টি সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১ হাজার ৮৮৯টি ঘরবাড়ির মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, পাঁচটি অঞ্চলের ২৩১টি সরকারি স্কুলের অন্তত ১ হাজার ১৫৯টি শ্রেণিকক্ষ এই কম্পনের ফলে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ভেঙে পড়েছে।
জেনারেল সান্তোস শহরের একটি ধসে পড়া মুদি দোকানের নিচে আটকে থাকা দু’জন কর্মচারীকে উদ্ধারে সকাল থেকেই তল্লাশি কুকুর নিয়ে কাজ শুরু করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। স্থানীয় একজন উদ্ধারকর্মী জানান যে এখন জীবিত উদ্ধারের চেয়ে লাশ উদ্ধারের দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে, যদিও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানাননি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে একটি বড় শপিং মল এবং স্কুলের বহুতল ভবন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে দেখা গেছে। অপর একটি ভিডিওতে তীব্র কম্পনের সময় ছোট ছোট স্কুলশিক্ষার্থীদের তাদের শিক্ষকদের জড়িয়ে ধরে চিৎকার করতে দেখা যায়।

ভূমিকম্পের পর পরই ফিলিপাইন এবং প্রতিবেশী ইন্দোনেশিয়ার উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনাসহ সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। তবে দুপুরের দিকে সেই বিপদের আশঙ্কা কেটে যাওয়ায় সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেয় আঞ্চলিক সুনামি সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে যে হালকা ঢেউ পৌঁছেছিল তার উচ্চতা ২০ সেন্টিমিটারের বেশি ছিল না। এর আগে গত অক্টোবরেও পূর্ব মিন্দানাও অঞ্চলে ৭ দশমিক ৪ এবং ৬ দশমিক ৭ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত আটজন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

seventeen + 7 =