যে কারণে খামেনির শেষকৃত্যে অংশ নিচ্ছেন না অনেক ইরানি

0
3

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্যানুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থার শীর্ষে থাকা এই নেতার বিদায় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজধানী তেহরানজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রার্থনা কমপ্লেক্সে শনিবার জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খামেনির মরদেহ রাখা হবে এবং সোমবার প্রধান সড়কগুলোতে অনুষ্ঠিত হবে বিশাল শোকযাত্রা। এই শেষযাত্রায় প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন বলে ধারণা করছে ইরান সরকার।

বার্তাসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, খামেনির শেষকৃত্যকে ঘিরে তেহরানের রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক কম। দোকানপাট বন্ধ রয়েছে এবং শহর থেকে বের হওয়ার পথগুলোতে তৈরি হয়েছে তীব্র যানজট। অনেক বাসিন্দা এই বিশাল সমাগম এবং এর নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিমান হামলায় খামেনির মৃত্যুর পর দেশটিতে ৪০ দিনের শোক ও ৭ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। এর আগে ৪ মার্চ থেকে তিন দিনব্যাপী বিদায় অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার কারণে তা স্থগিত করা হয়েছিল। বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি কমেনি।

সরকারের আয়োজন বনাম জনগণের ক্ষোভ: কেন এই অনীহা?

সব ইরানি যে এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে সমানভাবে আবেগাপ্লুত, তা নয়। মাত্র ছয় মাস আগেই খামেনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে ইরানে বিশাল জনবিক্ষোভ হয়েছিল।

এএফপি জানায়, খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানকে ঘিরে অনেক ইরানিই নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। আবার অনেকে দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এ ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ ও ব্যয়বহুল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে অনীহার কথা জানিয়েছেন।

অরাজনৈতিক ও ধর্মীয় আচরণে অভ্যস্ত নন এমন ইরানিরা মনে করছেন, এই আয়োজন শুধু সরকারের সমর্থকদের জন্য এবং এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সংকটের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

সাধারণ ইরানিদের অভিযোগ—ভূমিকম্প বা বন্যার মতো প্রকৃত জাতীয় দুর্যোগের সময়ে সরকার যে ধরনের জরুরি চিকিৎসা বা অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়, তা এখন একজন ‘স্বৈরাচারী’ নেতার শেষকৃত্যে বিলাসবহুলভাবে ওড়ানো হচ্ছে।

পূর্বের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেকেই অব্যবস্থাপনা এবং ভিড়ের চাপে পিষ্ট হয়ে প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন। আবার বড় ধরনের কোনো সন্ত্রাসী হামলা বা সহিংসতার ভয়ও তাদের তাড়া করছে।

তাছাড়া, এ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পুরো তেহরান জুড়ে তল্লাশি চৌকি, রাস্তাঘাট বন্ধ রাখা এবং কট্টর রক্ষণশীলদের উপস্থিতিতে একটি থমথমে ও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে অনেকের মত।

তেহরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের ৬৭ বছর বয়সী গৃহিণী এফাত বলেন, ‘অনুষ্ঠান ঘিরে অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এটা আমার প্রধান উদ্বেগ। এছাড়া আন্তর্জাতিক কোনো সহিংসতা বা সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কার কথাও ভাবছি। এমন কিছু ঘটলে সরকার সত্য উদঘাটনের আগেই ইসরায়েল বা বিরোধীদের মতো বিদেশি শক্তির ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়। আমি শুধু চাই যে যারা খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন, তারা যেন নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন।’

তেহরানের বাসিন্দা পেশায় অনুবাদক আজাদেহ বলেন, ‘তেহরানের অনেক বাসিন্দা ভিড় এড়াতে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। শহরটি অস্বাভাবিক রকমের শান্ত। তারা যে দেড় কোটি মানুষের সমাগমের কথা বলছে, তারা কারা আমি জানি না।’

‘লোকে বলাবলি করছে শনিবারের অনুষ্ঠানের জন্য সরকারি কর্মচারী ও স্কুলের শিশুদের পর্যন্ত অন্য শহর থেকে বাসে করে তেহরানে আনা হচ্ছে। আমি ওই শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। আশা করি তারা এই ভিড়ের মধ্যে বিপদে পড়বে না,’ বলেন তিনি।

তেহরানজুড়ে থমথমে পরিস্থিতির কথাও বলছেন অনেকে। তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা সাঈদও শহর ছেড়ে অন্যত্র যাচ্ছেন। তিনি জানান, শহরের অনেক রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তল্লাশি চৌকিগুলো আবার চালু হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘তীব্র গরমের মধ্যেও তেহরান থেকে বের হওয়ার রাস্তাগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। তেহরানের অনেক বাসিন্দা ইতোমধ্যে উত্তরাঞ্চলের দিকে চলে গেছেন। এখানে থাকা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে। চারপাশের পরিবেশ বেশ থমথমে। পুরো শহর নিরাপত্তা কর্মী ও রক্ষণশীল ধর্মীয় পোশাক পরা মানুষের ভিড়ে ঠাসা। এটি বেশ অস্বস্তিকর।’

‘আমার ধারণা তারা হয়তো সর্বোচ্চ ৪০-৫০ লাখ লোক জড়ো করতে পারবে। আর রাষ্ট্রীয় মিডিয়া দাবি করবে ২ কোটি মানুষ উপস্থিত হয়েছিল,’ বলেন সাঈদ।

অনেকে এই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আর্থিক ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন।

টোনেকাবন শহরের বাসিন্দা ৪৯ বছর বয়সী আলী বলেন, ‘সরকার বলছে তারা দেড় কোটি মানুষের জন্য খাবার, পানীয়, থাকার ব্যবস্থা ও অন্যান্য ব্যবস্থা করেছে। আমার প্রশ্ন হলো—এই টাকা কোথা থেকে আসছে? গত কয়েকদিনেই রুটি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সাধারণ মানুষ তো ইতোমধ্যেই এই আয়োজনের খেসারত দিতে শুরু করেছে।’

তেহরানের ৩৮ বছর বয়সী ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট কাভেহ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই অনুষ্ঠান সাধারণ মানুষের জন্য হতাশা ছাড়া আর কিছুই আনছে না। ভূমিকম্প বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক সংকটে কখনোই এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা, অস্থায়ী তাঁবু, ভ্রাম্যমাণ টয়লেট, জরুরি ইন্টারনেট, দ্রুত লজিস্টিক বা খাবার সরবরাহ করা হয়নি।’

‘অথচ এখন যুদ্ধ-বিধ্বস্ত অর্থনীতির মধ্যেও স্বৈরাচারী নেতার শেষকৃত্যানুষ্ঠানের জন্য বিলাসবহুল ও ব্যয়বহুল অনুষ্ঠানে জনগণের দেওয়া অর্থই ওড়ানো হচ্ছে। এটি জনগণের পকেট কাটার আরেকটি উপায়। এটি প্রশাসনের প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার ছাড়া আর কিছুই নয়,’ বলেন তিনি।

তেহরানের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী চিত্রশিল্পী এলনাজ বলেন, ‘আমাদের মতো সাধারণ মানুষ, যারা সাধারণ জীবনযাপন করি, ধর্মীয় আচরণে অভ্যস্ত নই, প্রশাসনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, তাদের দৈনন্দিন জীবনে খামেনি বেঁচে থাকা বা না থাকায় কোনো পার্থক্য নেই। তাই এই অনুষ্ঠান আমাদের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ হবে তা বুঝি না।’

‘বহু বছর ধরে এটাই মনে হয় যে একই দেশে বাস করেও আমাদের মতো সাধারণ মানুষ এবং সরকারের সমর্থকরা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে বাস করছে। এই অনুষ্ঠানটিও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মতোই, যা ইরানের সমাজের একটি অংশের জন্য আয়োজন করা হয়েছে,’ বলেন এই শিল্পী।

এই অনুষ্ঠানে বিশ্বের প্রায় ৩০টির বেশি দেশের নেতা ও প্রতিনিধিদল এবং ৯০টি দেশের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব অংশ নেবেন। এর মধ্যে পাকিস্তান, রাশিয়া ও চীনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হলেও কোনো পশ্চিমা রাষ্ট্রকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। অনুষ্ঠানটি কাভার করতে প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিক উপস্থিত থাকছেন।

তবে পুরো আয়োজনে সবচেয়ে বড় রহস্যের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন নতুন সর্বোচ্চ নেতা ও খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি। গত ফেব্রুয়ারির সেই একই বিমান হামলায় তার মা ও স্ত্রী নিহত হন এবং তিনি নিজেও আহত হন। এরপর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। এই শেষকৃত্যে তার সশরীরে উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি ইরানের বর্তমান ক্ষমতা কাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

আগামী ৯ জুলাই উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে (প্রয়াত আয়াতুল্লাহর জন্মস্থান) তাকে দাফন করা হবে। ইরানের স্পিকার বাঘের গালিবাফ এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানকে প্রতিশোধের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে জনগণকে বিশাল জনসমাগমের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি ইরানের সব জনগণকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আপনাদের উপস্থিতির মাধ্যমে ইসলামিক ইরানের ইতিহাসে একটি গৌরবময় অধ্যায় রচনা করুন। জাতির প্রতিশোধের এই ডাক যেন সারা বিশ্বের কানে গিয়ে বাজে।”

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

11 − seven =